বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের ব্যাপক প্রবৃদ্ধি এবং জিডিপিতে বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও রফতানি বাজারে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে না। এর প্রধান কারণ বিদ্যমান কাঠামোগত জটিলতা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস নীতিমালার সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনা। আজ রাজধানীর সিরডাপ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও রফতানি বৃদ্ধি’ শীর্ষক এক জাতীয় সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সম্মেলনে বিল্ডের গবেষণা প্রতিবেদন ‘প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনা: বন্ডেড ওয়্যারহাউস নীতিমালা ও বাংলাদেশের এসএমই রফতানি প্রতিযোগিতা’ প্রকাশ করা হয়, যেখানে তৈরি পোশাক (আরএমজি) বহির্ভূত এসএমই খাতগুলোর বিশ্ববাজারে প্রবেশের প্রধান প্রধান কাঠামোগত বাধাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, এসএমই খাতের প্রবৃদ্ধিতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং আজকের সম্মেলনের সুপারিশগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে। তিনি জানান, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে এডিবির সহায়তায় একটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে এবং পূর্বাচলে ১৫০ একর জমিতে একটি ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া একটি নির্দিষ্ট কমিশনের মাধ্যমে নীতি বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং অলিগার্কিক কাঠামোর পরিবর্তে সব ধরনের এন্টারপ্রাইজকে সহায়তা করতে স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস তৈরির কাজ চলছে। উদ্যোক্তাদের সচেতন করতে উদ্ভাবনী যোগাযোগ কৌশল, ড্যাশবোর্ড তৈরি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর কর হ্রাসের বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সম্মেলনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরএমজি খাতের মতো হোম টেক্সটাইল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য খাতেও সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদানের আহ্বান জানান। ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি আংশিক রফতানিকারকদের জন্য বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থার সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান দেশের অর্থনীতিতে এসএমই-এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এসএমই খাত আমাদের মোট শিল্প খাতের ৯০ শতাংশ এবং জিডিপির এক-চতুর্থাংশ হলেও বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে রফতানিতে এর অবদান খুবই সীমিত। বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাই রপ্তানি বৈচিত্র্য এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং অপরিহার্য।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় বিল্ডের গবেষণা পরিচালক ড. ওয়াসেল বিন শাদাত জানান, জরিপকৃত ১০৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেউ কখনো বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা ব্যবহার করেনি এবং এসআরও-৩৮৪ সম্পর্কে সচেতনতা মাত্র ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। হোম টেক্সটাইল খাতে সুতার ওপর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্কের কারণে বিশ্ববাজারে দেশীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। তবে ডিউটি-ফ্রি সুবিধা ও সহজ নিয়ম পেলে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রফতানিতে আগ্রহী। এ সংকট উত্তরণে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক-আইনি সংস্কার, সাধারণ অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক সূচক নির্ধারণের প্রস্তাব করেন।
বিল্ডের সিইও ফেরদৌস আরা বেগম ওয়ার্কিং সেশন পরিচালনা করার সময় উল্লেখ করেন, সম্ভাব্য রফতানিকারকদের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশও যদি সফল হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক রফতানি খাতে বড় অবদান রাখবে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করার সরকারি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক-২ (অতিরিক্ত সচিব) ড. আহমেদ উল্লাহ বক্তব্য রাখেন। এনবিআরের প্রথম সচিব মোহাম্মদ নাজিউর রহমান মিয়া জানান, প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ এর আলোকে এসআরও-৩৮৪-এ পরিবর্তন এনে ভ্যালু অ্যাডিশন রেশিওর ৩০ শতাংশের শর্ত তুলে দেয়া হয়েছে এবং আরো নয়টি খাতকে বন্ডেড সুবিধা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমইএসপিডি বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা জানান, এসএমই খাতের জন্য ৯ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল রয়েছে। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে এসএমই ফাউন্ডেশনের ডিএমডি নাজিম হাসান সাত্তার ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, বাপার সিইও বিল্লাল হোসেন কোল্ড চেইন ও ব্র্যান্ডিং এবং বিসিকের জেনারেল ম্যানেজার সরোয়ার হোসেন বিসিকের কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টারের মাধ্যমে বন্ডেড সুবিধা প্রদানের ওপর জোর দেন।